বুধবার , আগস্ট ১২ ২০২০
Home / NEWS / সরকারি প্রকল্পের একটি প্লাস্টিকের ড্রাম ১০ হাজার টাকা

সরকারি প্রকল্পের একটি প্লাস্টিকের ড্রাম ১০ হাজার টাকা

সরকারি প্রকল্পের একটি প্লাস্টিকের ড্রাম ১০ হাজার টাকা

কোনোভাবেই থামছে না সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে পণ্য ক্রয়ে অস্বাভাবিক দামের প্রস্তাব দেয়া। এ যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এবার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে ১০ হাজার টাকা করে ধরা হয়েছে একেকটি প্লাস্টিক ড্রাম ও বঁটির দাম।

শুধু তাই নয়, একটি অ্যালুমিনিয়ামের বড় চামচ এক হাজার টাকা ও এক কেজি মসলা রাখার প্লাস্টিকের পাত্রের দাম দুই হাজার টাকা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এরকম আরও অনেক পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রেই রয়েছে বাজারের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাম। গত ১৪ জুলাই ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

এর আগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্পে বাজারের তুলনায় বিভিন্ন পণ্যের অস্বাভাবিক দাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। অনেকগুলোর ক্ষেত্রে ক্রয় করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বালিশ-কাণ্ড, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ৩৭ লাখ টাকায় পর্দা ক্রয় এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন ৪ লাখ টাকা, একটি মাস্কের দাম ৮৫ হাজার টাকা ও একটি স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল।

তাৎক্ষণিকভাবে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই বারবার এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেয়া থামছে না। দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করতেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকও। গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সোমবার বলেন, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমার পক্ষে একটি একটি করে পৃষ্ঠা উল্টে দেখা সম্ভব হয় না। তবে আমি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যদের ওপর আস্থা রাখি। তারা সবকিছু ঠিক করে আমাকে দেন। আমি প্রকল্পগুলো একনেকে নিয়ে যাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেখানে যদি এরকম অস্বাভাবিক দাম ধরা থাকে এটা খুবই দুঃখজনক।

আমি ব্যবস্থা নিতে ফোনে কৃষিমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছি। সেই সঙ্গে আজ (সোমবার) কেবিনেট মিটিং শেষেও তাকে অনুরোধ জানিয়েছি। তাছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্যের কাছেও এ বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তিনি বলেছেন, দাম যাই ধরা থাকুক, দরপত্রের মাধ্যমে জিনিসপত্র কেনা হবে। তাহলে বেশি দামে তো কেনা যাবে না। কিন্তু আমি এটা মনে করি না। কারণ, বেশি দাম ধরা থাকলে ঠিকাদাররা সুযোগ পেয়ে যায়। তাই আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি অবশ্যই দুর্নীতির পথ তৈরি করতে করা হয়েছে। সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালীরা তাদের অর্থ বৃদ্ধি করতেই এসব পথ বেছে নিচ্ছে। বালিশ ও পর্দাসহ কেনাকাটায় নানা কেলেঙ্কারির ঘটনার পরও তারা কীভাবে এটা করার সাহস পায়? দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এমন শাস্তি না হওয়ার কারণেই বারবার একই ধরনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি দেশের ৬৪ জেলার সবকটি উপজেলায় বাস্তবায়ন করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। এটি বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে কৃষিকে ব্যবসায়িকভাবে অধিকতর লাভজনক ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। চলতি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার বৃদ্ধি করে ফসলের ১০-১৫ শতাংশ অপচয় রোধ, চাষাবাদে ৫০ শতাংশ সময় এবং ২০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় করা যাবে। পাশাপাশি সমন্বিত সবজাতীয় ফসল আবাদ করে কৃষি যন্ত্রপাতির ৫০ শতাংশ কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা যাবে। এ ছাড়া যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দরিদ্রতা কমানো সম্ভব হবে বলে এত টাকা ব্যয়ে হাতে নেয়া হয়েছে প্রকল্পটি।

ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ প্রকল্পে বঁটি, খাবার প্লেট, প্লাস্টিকের বাটি, চামচ ও চালের ড্রাম, চেয়ার, টেবিল, সোফা, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্ট টেলিভিশন, এসি ও ফ্রিজসহ বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত দাম ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি প্রস্তাব পাওয়ার পর পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় এসব খুঁটিনাটি বিষয় দেখার কথা পরিকল্পনা কমিশনের। কিন্তু প্রক্রিয়াকরণ শেষে এটি অনুমোদনও পেয়েছে একনেক বৈঠকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প প্রস্তাবে ২০০ লিটারের পানির প্লাস্টিকের ড্রামের (চাউলসহ) দাম ধরা হয়েছে একেকটি ১০ হাজার টাকা। এরকম ৩৬টির জন্য বরাদ্দ তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে এরকম একটি ড্রামের দাম ৫-৭শ’ টাকা। রান্নার জন্য সবজি কাটতে বড় একেকটি বঁটির দাম ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। বাজারে এরকম বঁটি ৩-৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া সম্ভব। ৩৬টি বঁটি কেনায় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে এক কেজি ধারণক্ষমতার প্রতিটি মসলাপাত্রের দাম ২ হাজার টাকা।

জরুরি ভিত্তিতে কিছু একটা করা দরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
৯০টি মসলাপাত্র কিনতে মোট ব্যয় হবে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বাজারে ভালো মানের মসলাপাত্র সর্বোচ্চ ৪শ’ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ৯০টি অ্যালুমিনিয়ামের চামচ কেনা হবে ৯০ হাজার টাকায়। প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা। অথচ এগুলোর বাজারমূল্য ৩শ’ টাকার মতো। এ ছাড়া মাঝারি আকারের ৯০টি চামচ কেনা হবে ৪৫ হাজার টাকায়

Check Also

দোকান পাট খোলা রাখার সময় বাড়লো রাত ৯ টা পর্যন্ত

দোকান পাট খোলা রাখার সময় বাড়লো রাত ৯ টা পর্যন্ত পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মঙ্গলবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *